দারুচিনি দ্বীপ : এক দুঃসাহসিক জীবন যুদ্ধের গল্প
না এটা প্রখ্যাত উপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদের দারুচিনি দ্বীপ নয়। এ গল্প খুব সাধারণ এক মানুষের অসাধারণ জীবন যুদ্ধের গল্প। হয়ত বা সে বিখ্যাত কেউ না যে তাকে নিয়ে ফিচার করা যায়। তবে সে এমন একজন যে জীবনে সব কিছু হারিয়েও হাসি মুখে মাথা উচু করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার সাহস পায়। বাস্তবে যান্ত্রিক চেয়ারের সাহায্যে চলাফেরা করলেও মনের রাজ্যে সে একেবারেই আলাদা। সেখানে নেই কোন হারানোর ভয়। দারুচিনি দ্বীপ তারই সৃষ্ট এক কল্পরাজ্য। যে কারনে এত ভনিতা করলাম। আজ আমি আপনাদের একজন সাধারন মানুষের জীবন যুদ্ধের কথা বলব। সব হারালেও হারায়নি যার মনোবল।
১৯৬২ সালের ২৯ অক্টোবর রংপুরে তার জন্ম। ছেলেবেলার বেশিরভাগ সময় কেটেছে ঢাকাতে ( তখন ইস্ট পাকিস্তান)। ১৯৭১ সালে বাবার চাকরির সুবাদে পাকিস্তানেই যুদ্ধ বন্দি হয়ে থাকতে হয়েছে বেশ কিছুটা সময়। দেশ স্বাধীনের পর মির্জাপুর ক্যাডেট থেকে পাশ করে বেরিয়ে চট্টগ্রামের জুল্ডিয়া মেরিন একাডেমিতে যোগ দেন নাবিক হবার লক্ষ্য নিয়ে। সময়ের স্রোতে তাকে এগিয়ে নিয়ে যায় সামনের দিকে। দুচোখে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় তার নাবিক হিসেবে পথ চলা। লন্ডন থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগও তার হয়েছে বইকি। এক পর্যায়ে সংসারে বাঁধনে বাধা পড়েন তিনি।
সালটা ছিল সম্ভবত ১৯৮৮। নিজের পছন্দেই বিয়ে। পাঁচ ভাইবোনের মাঝে সে মেজ। ভাই বোন সবাই যার যার মত সংসারি হয়েছে ভাল আছে। সব কিছুই চলছিল সুন্দর ভাবেই। ৪/৫ বছরের সুখি দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে না করতে সব যেন অন্ধকার হয়ে গেল। ১৯৯৩ সালে আকস্মিক এক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তার চলত শক্তি। সুইমিং পুলে ডাইভ করবার সময় বেকায়দা ভাবে আঘাত লেগে ভেঙ্গে যায় তার সারভাইকাল স্পাইনাল কর্ড।
চিকিৎসার কোন ত্রুটি হয়নি। দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে কিন্তু জীবনটা ফিরে পেলেও বুক থেকে নিচের দিকের সব অনুভূতি তার চলে যায় চিরতরে। অনেক আলোর মাঝেও তার চারপাশটা ভরে যায় শুধুই অন্ধকারে। এ কেমন জীবন! নিথর অচল দেহটা শুধু পড়ে আছে। চেনা পরিবেশটাও যেন অচেনা লাগে তার। দৈনন্দিন কাজ গুলি আর নিজে করতে পারেন না। অন্য কার সাহায্য ছাড়া কিছুই করা আর তার পক্ষে সম্ভব না।
যার জীবন ছিল দেশ থেকে দেশান্তরে পাড়ি দেয়া তাকেই কিনা চারদেয়ালে বন্দি হয়ে কাটাতে হয় অন্যের অনুগ্রহে। কিন্তু সে থেমে থাকে নি। এক বছর যেতে না যেতে নিজেকে সামলে নেন সুন্দর ভাবে । কম্পিউটার কে বেছে নেন নিত্য দিনের সাথী হিসেবে। চলার শক্তি না থাকলেও দুই হাত তিনি নাড়াতে পারতেন। বিশেষ ভাবে তৈরি কাঠ হাতের সাথে বেধে শুরু করেন তার নতুন ভাবে পথ চলা। কিছুটা দক্ষতা অর্জনের পর বাচ্চাদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন তিনি। এভাবেই চলতে থাকে তার জীবন। এর মাঝে মেরিন একাডেমির পক্ষ থেকে তাকে দেয়া হয় ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার। জীবনে আসে এক অভাবনীয় পরিবর্তন। অচল মানুষটা হয়ে ওঠে সচল। চারদেয়ালের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। জীবনকে অনেক সুন্দর মনে হয় তার।
কি মনে হয় এতেই সন্তুষ্ট হতে পেরেছিলেন তিনি? না বসে থাকেন নি। নিজেকে দক্ষ করে তুলেছেন ওয়েব ডিজাইনিং, সফটওয়্যার তৈরির কাজে। বেশ কিছু ওয়েব সাইট তিনি ডিজাইন করেছেন। এমন কি বাংলা টাইপ বেটা ভার্সন তৈরির ব্যাপারেও তার অবদান রয়েছে। এছাড়াও ভিডিও এডিটিং সহ মাল্টিমিডিয়ার বেশ কিছু কাজ তিনি পারেন বেশ দক্ষতার সাথেই।
বাংলা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় পারদর্শী এই জীবন যোদ্ধার নাম শহিদুল আলম। যার বেশির ভাগ সময় কাটে কম্পিউটারের সামনে বসে। নাহয় টিভি দেখে। নিজেকে কারো বোঝা ভাবতে চাননি বলেই হয়ত স্ত্রীকে মুক্তি দিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। এত কিছুর পরও তার দুচোখে স্বপ্ন মানুষের জন্য কিছু করবার। কারো করুণা নিতে তিনি আগ্রহী নন একেবারেই।
আমাদের দেশেও প্রতিভা রয়েছে। আত্তসচেতনা আর নিজের দ্বায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেবার মানসিকতা নিয়ে তিনি এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। হয়ত স্বাভাবিক জিবনে তিনি আর কোনদিন যেতে পারবেন না হয়ত পারবেন তবু অজানা এই পথকে তিনি হাসি মুখে বরণ করে নিয়েছেন পরম মমতায়।
আমরা কি পারিনা এমন মানুষ গুলির পাশে দাঁড়াতে তাদের জন্য কিছু করতে
অস্ট্রেলিয়াতে এমন মানুষদের জন্য রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার আছে। চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা আছে ডিসএবলদের জন্য। সরকারি ভাবে বিশেষ সহযোগিতা করা হয়, বাসাতেই তাদের জন্য ট্রেইন্ড কেয়ারার দেয়া হয়। প্রায় সব খানেই ডিসএবল এক্সেস আছে বিশেষ র্যাম্প এর ব্যবস্থা আছে। যাতে করে হুইল চেয়ার নিয়ে যাওয়া যায়। এদের মনোবল বাড়াতে রাখা হয় বিভিন্ন একটিভিটি।
লিংক গুলি থেকে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
www.daruchinidip.com
www.banglapad.com
www.bdnews.com
জিয়া
26 June 2012 - 4:37pm
Permalink
May Allah bless him.
আল্লাহ তাঁকে সুস্থতা দান করুন । তাঁকে কর্মবাস্ত্যতা এবং সাফল্য দান করুন । আমিন।
Tonmoy Ahmed
26 June 2012 - 8:12pm
Permalink
মিম আপু, লেখাটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো
মিম আপু, লেখাটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো।শত প্রতিকূলতার মাঝেও যে বিশ্বাস আর আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মেধার বিকাশ ঘটানো সম্ভব তাই যেন প্রতিফলিত হোল আপনার চমৎকার লেখায়। পরম করুনাময় আমাদের সবাইকে তাঁর রহমতের ছায়ায় রাখুন।শুভ কামনা রইল।
Syed Reazul Hassan
1 July 2012 - 6:34pm
Permalink
বাস্তব কিন্তু সত্য !!!!
আসসালামু আলাইকুম,
লেখাটি পড়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। কারন একটি বাস্তব সত্য ঘটনা এবং সুন্দর উপস্থাপনা।
আপনার মনের আকুলতা যেন বাস্তব রূপ নিতে পারে সেই দোয়াই করি। শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই নয় বর্তমান বিশ্বে উন্নত শহরের মার্কেট, রেস্তরা, সিনেমা হল বা থিয়েটার হলে ডিসাবেল টয়লেট , ডিসাবেল এক্সেস থাকতে হবে নয়ত সরকার প্লান পাস করবে না। ইউরোপ সহ আমেরিকা, এমনকি সিংগাপুরের মত জায়গায় এই ব্যাবস্থা রাখতে হয়। আপনাদের সিডনী অপেরা হাউজেও ডিসাবেল সুযোগ সুবিধা রাখা হয়েছে যা অ-নে-ক আগে ছিল না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশে ডিসাবেল (যাদের বুদ্ধি বৃদ্ধি হয় না) কে পাগল মনে করা হয়। সেখানে বসে আপা আমি ওনার জন্য দোয়া করছি। তাঁর মত মানসিক শক্তি আমরা সবাই পাই। ভাল থাকবেন।
mim
3 July 2012 - 8:58am
Permalink
সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময়
সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় নিয়ে লেখাটা পড়বার জন্য। রিয়াজুল ভাই আপনি ঠিকই বলেছেন বর্তমান উন্নত দেশ গুলিতে সব যায়গাতেই ডিসএবেল এক্সেস আছে বা থাকতে হয়।
"বর্তমান উন্নত দেশ" বললাম এই কারনে যে আমরা ২০২৫ সালে যে মানবিক মহা সমাজের স্বপ্ন দেখছি সেটা বাস্তবায়িত হলে আমাদের দেশ হবে সব থেকে সেরা।
ইনশাআল্লাহ্ ।